যশোর জেলা প্রতিনিধিঃ
যশোরের ঐতিহ্যবাহী নদ ভৈরব। বর্তমানে এই নদজুড়ে শেওলা ও কচুরিপানায় ঠাসা। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই। নদের বিভিন্ন অংশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখা যায়। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি থাকায় নদের পানি গোসল, গৃহস্থালি ও কৃষিকাজে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয় জনসাধারন জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, যশোর শহরের দড়াটানা থেকে পুরাতন খয়েরতলা, নূরপুর, পুলতাডাঙ্গা, আব্দুলপুর, বড় হৈবতপুর হয়ে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা পৌরসভা পর্যন্ত ভৈরব নদের বিভিন্ন অংশে শেওলা ও কচুরিপানা ঘন হয়ে জমে আছে। দড়াটানা থেকে পূর্বে নীলগঞ্জ সেতু, রাজারহাট, রূপদিয়া ও বসুন্দিয়া পর্যন্ত নদের বিভিন্ন অংশেও একই দশা। এসব এলাকায় কচুরিপানা ও শেওলার সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা আটকে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে।
পুনঃখননের পরও ফেরেনি পূর্বের রূপ
একসময় ভৈরব ছিল এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ নদে জাহাজ চলাচল করত বলে জানা যায়। ছিল জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক প্রবাহ। জবরদখল ও পলি জমে দীর্ঘদিন নদটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে ছিল দীর্ঘদিন। সরকারের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কয়েক বছর আগে ভৈরব পুনঃখনন করা হয়। তবে পুনঃখননের পরও নদটি আগের রূপ ফিরে পায়নি বলে জানিয়েছেন ভৈরব পাড়ের স্থানীয় বাসিন্দারা। জোয়ার-ভাটার প্রবাহও স্বাভাবিক নয়। নদের বিভিন্ন অংশে শেওলা ও কচুরিপানায় পানি আছে কি নেই, তা এখন বোঝা যায়না বললেই চলে।
গোসল-সেচ বন্ধ, দূষিত পানিতে দুর্ভোগ
যশোরবাসীর ভাষ্যে জানা যায়, কচুরিপানা ও শেওলায় নদের পানিতে ছোট ছোট স্রোত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ময়লা-আবর্জনা এক জায়গায় জমে পানির মান ক্রমে আরও খারাপ হচ্ছে। ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় নদের দুই পাড়ের পরিবারগুলো গোসল, কাপড় পরিষ্কার কিংবা গৃহস্থালির কাজে পানি ব্যবহার করতে পারছে না। কৃষকেরা সেচকাজেও এ পানি ব্যবহার করতে পারছেন না বলে জানান তাঁরা।
বড় হৈবতপুর গ্রামবাসী জানান, নদের পাড়ে অনেকের জমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ভৈরবের পানি ফসল সেচে ব্যবহার করলেও এখন তা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। শেওলা ও কচুরিপানায় পানি আটকে দূষিত হওয়ায় সেচে ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য মতে, দূষিত পানি ফসলের জন্য ক্ষতিকর, এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড বিষয়টি গুরুত্ব দিলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
চর্মরোগের ভয়
আব্দুলপুর গ্রামের বেশ কয়েকজন পেশাজীবি ও শ্রমজীবি মানুষ জানিয়েছৈন, শেওলা ও কচুরিপানায় নদে ময়লা জমে থাকার ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নেই। দ্রুত শেওলা, কচুরিপানা ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন। চর্মরোগের ভয়ে এখন কেউ নদের পানিতে নামতে চান না বলে জানিয়ে তাঁরা বলেন, আগে মাঝেমধ্যে নদে মাছ ধরত গ্রামের মানুষ, কিন্তু কিছুদিন ধরে চর্মরোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে এখন কেউ পানিতে নামে না। একসময় ভৈরবের পানি স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ছিল। গোসল, কাপড় পরিষ্কার এমনকি রান্নাবান্নার কাজেও এ পানি ব্যবহার হতো। প্রায় এক বছর ধরে শেওলা ও কচুরিপানা পরিষ্কার না করায় ময়লা জমে পানি এখন নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান তাঁরা।
ভৈরব পাড়ের আর একটি গ্রাম বসুন্দিয়া এলাকাবাসি জানিয়েছেন, নদের পানি আগে পশু-মানুষের গোসল এবং কৃষিকাজে সেচ দেওয়ার কাজে ব্যবহার হতো। এখন কচুরিপানা, শেওলা ও ময়লা-আবর্জনায় পানি কালো ও নোংরা হওয়ার কারনে এই পানি কোনো কাজে ব্যবহার করার উপযোগী নেই বলে তাদের দাবি। দ্রুত ভৈরবের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
নদীপাড়ে বেড়েছে চর্মরোগী
যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল সাদিক রাসেল বলেন, চর্মরোগীর সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে ভৈরব নদের দুই পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে এই রোগের হার বেশি। দূষিত পানিতে গোসল করায় তাঁরা বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
লবণ ছিটালে বন্ধ হবে
নদে শেওলা ও কচুরিপানা জন্মানোর ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানান, ভৈরবের পানি মিষ্টি, সে কারণেই অতিরিক্ত শেওলা ও কচুরিপানা জন্মায়। লবণ পানিতে এগুলো জন্মায় না, ভৈরব নদে লবণ ছিটিয়ে দিলে এর জন্ম বন্ধ হবে বলে জানিয়ে তিনি। যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা বলেন, পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নদে লবণ মেশানো সম্ভব নয়। শেওলা ও কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট নেই বলে জানান তিনি। তবে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে এবং বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তবে ভৈরব পরিষ্কার করার বিষয়টি নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন যশোর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কমলেশ মজুমদার।
আরও পড়ুনঃ নীলফামারীতে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত। দুই গুনি শিক্ষককে সম্মননা প্রদান।
হত্যা সহ ৩০ মামলার আসামী ‘পিচ্চি রাজা’ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা সাজানো, জড়িত এসআই- পুলিশ কমিশনার